সরিষাবাড়ীর দর্শনীয় স্থান সমূহ
জামালপুর জেলার হৃদয়স্থলে অবস্থিত সরিষাবাড়ী উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আধুনিক বিনোদন কেন্দ্রের জন্য পরিচিত। যমুনা নদীর তীরে বিস্তৃত এই উপজেলায় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সবুজ পার্ক, নদীতীরের ঘাট, ঐতিহ্যবাহী মসজিদ-মন্দির এবং শিল্পকারখানার সমন্বয়ে এই উপজেলাটি। এই আর্টিকেলে আমরা সরিষাবাড়ীর কয়েকটি প্রধান দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
জামালপুর সরিষাবাড়ী পার্ক
জামালপুর সরিষাবাড়ীতে বেশ কয়েকটি পার্ক রয়েছে। পার্কগুলোর বয়স খুব বেশি নয়। বাংলাদেশের শহুরে জীবনের বেশ কিছু ছোয়া ইদানিং থানা শহরগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় কিছু পার্ক সরিষাবাড়ীতে হয়েছে। নিচে আমরা জনপ্রিয় তিনটা পার্ক নিয়ে আলোচনা করবো।
মেয়র পার্ক বাউসী
পৌর শহরের হৃদয়ে অবস্থিত বাউসী মেয়র পার্ক সরিষাবাড়ীর একটি উদীয়মান দর্শনীয় স্থান। এই পার্কটি স্থানীয় পৌরসভার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এবং এর নামটি সাবেক মেয়র রুকনের নামানুসারে রাখা হয়েছে। এটা বাউসী পপুলার পার্ক নামেও পরিচিত। সুন্দর ল্যান্ডস্কেপিং, জলাশয় এবং ছায়াবৃত গাছের নিচে বিশ্রামের বেঞ্চ এখানকার আকর্ষণ। বাউসী ব্রিজের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এটি ঝিনাই নদীর দৃশ্যসহ একটি আদর্শ পিকনিক স্পট। এছাড়া নদীর উপর নির্মিত রেল ব্রিজ এর আকর্ষনকে আরও বহুগুনে বাড়িয়ে তুলেছে। সকালের কুয়াশায় বা সন্ধ্যার সোনালি আলোয় এখানে হাঁটলে মন ভরে যায়। পার্কে ছোটখাটো খাবারের স্টল ছাড়াও ইদানিং বেশ কিছু আধুনিক ক্যাফে গড়ে উঠেছে, যেখানে স্থানীয় ফুচকা, চটপটি থেকে শুরু করে ফাস্ট ফুড আইটেমও পাওয়া যায়। উৎসবের দিনগুলো যেমন দুই ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি সময়ে এখানে প্রচুর জনসমাগম থাকে।
স্বপ্ননীল পার্ক জামালপুর সরিষাবাড়ি
সাতপোয়া গ্রামে অবস্থিত স্বপ্ননীল পার্ক সরিষাবাড়ীর সবচেয়ে আধুনিক এবং জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এটি একটি ওয়াটার-বেসড নান্দনিক পার্ক, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার রাইড, স্লাইড এবং পুল রয়েছে। গ্রীষ্মকালে পরিবার নিয়ে এখানে আসা অত্যন্ত আনন্দদায়ক। পার্কের চারপাশে সবুজ পরিবেশ এবং কৃত্রিম জলাশয় এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। প্রবেশ টিকেট প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ৩০ টাকা। সন্ধ্যাকালে লাইটিংয়ের মাধ্যমে পার্কটি একটি স্বপ্নিল আলোকরশ্মিতে রূপান্তরিত হয়। এখানে খাবারের জন্য রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে বাংলা এবং ফাস্ট ফুড পাওয়া যায়। সরিষাবাড়ী শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই পার্কটি সহজেই অটোরিকশায় পৌঁছানো যায়।
shopnonil park স্বপ্ননীল পার্ক photos
স্বপ্ননীল পার্কের সৌন্দর্য কথায় বর্ণনা করা যায় না, তবে এর ছবিগুলো দেখলে আপনার মন টানতে বাধবে। পার্কের ওয়াটার স্লাইডগুলো থেকে ছিটকে পড়া জলের ফোঁটা, সবুজ ঘাসের উপর ছড়িয়ে থাকা রঙিন বেলুন এখানকার আকর্ষণের প্রমাণ। সন্ধ্যায় লাইটের আলোয় পার্কটি একটি রঙিন স্বপ্নলোকের মতো।
যমুনা গার্ডেন সিটি / যমুনা সিটি পার্ক
পোগলদিঘা ইউনিয়নে যমুনা সার কারখানার কাছাকাছি অবস্থিত যমুনা গার্ডেন সিটি একটি বহুমুখী বিনোদন কেন্দ্র। এখানে পার্ক, গার্ডেন এবং ছোটখাটো অ্যামিউজমেন্ট রাইড রয়েছে, যা সারা বছর পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সবুজ ঘাসের মাঠ, ফুলের বেড এবং কৃত্রিম হ্রদ এই স্থানকে একটি শান্তির আশ্রয় করে তুলেছে। এছাড়া পিকনিকের জন্য এটি খুবই জনপ্রিয়। পার্কের সাথে যুক্ত রেস্তোরাঁয় স্থানীয় খাবার যেমন ইলিশ মাছে ভাজা, খিচুড়ি পাওয়া যায়। যমুনা নদীর কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সূর্যাস্তের সময় এখানকার দৃশ্য অপূর্ব। প্রবেশ ফি নামমাত্র, এবং সরিষাবাড়ী শহর থেকে ইজিবাইক করে ৪৫ মিনিটের পথ।
জেটি ঘাট
তারাকান্দির যমুনা সার কারখানা গেট থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেটি ঘাট সরিষাবাড়ীর একটি ঐতিহাসিক নদীতীর। পুরানো জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের অংশ হিসেবে এটি ছিল ষ্টীমার স্টেশন, যা নদীর নাব্যতা হারানোর পর বিলুপ্ত হয়। আজও এখানে যমুনা নদীর বিশালতা উপভোগ করা যায়। সকালে মাছ ধরতে আসা নৌকাগুলোর দৃশ্য এবং সূর্যোদয়ের লালিমায় রাঙানো নদীতীর এটিকে কবিদের স্বর্গ করে তুলেছে। পর্যটকরা এখানে নৌকা ভাড়া করে নদীভ্রমণ করতে পারেন, যার খরচ প্রায় ২০০-৩০০ টাকা। আওনা ইউনিয়নের অন্তর্গত এই ঘাটটি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অপরিহার্য।
যমুনা সার কারখানা
এশিয়ার বৃহত্তম সার কারখানা হিসেবে পরিচিত যমুনা সার কারখানা সরিষাবাড়ীর তারাকান্দিতে অবস্থিত। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ড। পর্যটকরা পূর্বানুমতি নিয়ে কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, যা শিল্পপ্রিয়দের জন্য আকর্ষণীয়। কারখানার চারপাশে সবুজ এলাকা এবং যমুনা নদীর দৃশ্য এটিকে একটি শিল্প-প্রকৃতি সমন্বিত স্থান করে তুলেছে। বার্ষিক ৫.৬১ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে এটি উত্তরবঙ্গের ১৯টি জেলায় সার সরবরাহ করে। সরিষাবাড়ী থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত, এখানে যাওয়ার জন্য সিএনজি সবচেয়ে সুবিধাজনক। এছাড়া সার কারখানাটির কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নির্মিত কলোনিটি আরেকটি দর্শনীয় স্থান। কলোনির একজন বাসিন্দা কাজী আতাহার সাহেব বলেন,
জেএফসিএল কলোনি হলো সরিষাবাড়ীর কলিকাতা শহর।
তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ
সরিষাবাড়ীর আরামনগর বাজার থেকে সহজেই পৌঁছানো যায় এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে। নান্দনিক স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ উপজেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর সুন্দর নমুনা এই মসজিদটি ইতিহাসের সাক্ষী। নামাজের সময় এখানে ইবাদতের এক পরিবেশ অনুভব করা যায়। পর্যটকরা এখানে ভ্রমন ও ছবি তোলার জন্য আসেন দূর দূরান্ত থেকে।
রসপাল জামে মসজিদ
উপজেলার আরেকটি প্রাচীন স্থাপনা পিংনা রসপাল জামে মসজিদ, যা তার সরলতা এবং ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। এখানকার মিনার এবং গম্বুজের নকশা মুঘল যুগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। স্থানীয় মানুুুষজনের কাছে এবং পর্যটকদের জন্য এটি একটি শান্তির স্থান।
খাগুরিয়া কালিমন্দির
মহাদান ইউনিয়নে অবস্থিত খাগুরিয়া কালিমন্দির হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। দুর্গা পুজোর সময় এখানে বিশাল মেলা বসে, যা হিন্দু পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মন্দিরের চারপাশে সবুজ এলাকা এবং বিশাল বটগাছ এর অন্যতম আকর্ষণীয় দিক।
আবুল হোসেন সরকারের আম বাগান
পোগলদিঘা ইউনিয়নের চর পোগলদিঘা গ্রামে অবস্থিত এই বিশাল আম বাগান গ্রীষ্মকালে আমপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ। হাজারো আম গাছের নিচে ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে তাজা আম খাওয়ার আনন্দ অনন্য। মে-জুন মাসে এখানে আম মেলা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।