সরিষাবাড়ী কিসের জন্য বিখ্যাত?

জামালপুর জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত সরিষাবাড়ী উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প-সাহিত্যের জন্য বিখ্যাত। এই উপজেলার নামকরণই তার সরিষা উৎপাদনের সাথে জড়িত, যা এখানকার মাটির উর্বরতার প্রমাণ। একসময় পাটশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটি এখন সার কারখানা, মিষ্টি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে। এই আর্টিকেলে আমরা সরিষাবাড়ীর বিখ্যাত কিছু জিনিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে পাঠকরা নতুন কিছু জানতে পারেন।

সরিষার উৎপাদন

সরিষাবাড়ীর নামকরণের মূলে রয়েছে এখানকার বিখ্যাত সরিষা চাষ। উপজেলার উর্বর মাটি এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনার উপকূলে অবস্থান সরিষা, ধান, পাট এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সরিষাবাড়ীতে সরিষা, গম, ভুট্টা, আখ, চীনাবাদাম এবং মিষ্টি আলু প্রধান ফসল। এখানকার সরিষা তেলের মান এত উচ্চ যে এটি স্থানীয় বাজারের একটি প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য। শীতকালীন মৌসুমে সরিষার সোনালি মাঠ উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। সরিষা উৎপাদনের ফলে এখানকার অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে এবং এটি উপজেলার পরিচয়ের প্রধান অংশ।

সরিষাবাড়ী কিসের জন্য বিখ্যাত?
সরিষাবাড়ী কিসের জন্য বিখ্যাত? – সার কারখানা, প্যারা মিষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী নকশী কাঁথা

প্যারা মিষ্টি

সরিষাবাড়ীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ঐতিহ্য হলো 'প্যারা সন্দেশ' বা প্যারা মিষ্টি। এটি গরুর খাঁটি দুধের ঘন ক্ষীর এবং চিনির মিশ্রণে তৈরি একটি শুকনো সন্দেশ, যা স্বাদে-গন্ধে অনন্য। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সরিষাবাড়ীর প্যারা সন্দেশ এ অঞ্চলের গর্ব এবং বহু বছর ধরে বাপ-দাদার আমল থেকে তৈরি হয়ে আসছে। প্রতি কেজিতে ৭০-৭২টি প্যারা পাওয়া যায় এবং দৈনিক ৩০০-৩৫০ কেজি বিক্রি হয়। এই মিষ্টির সুবিধা হলো এটি শুকনো হওয়ায় দূর-দূরান্তে বহনযোগ্য এবং ইউরোপ-আমেরিকায় পর্যন্ত রপ্তানি হচ্ছে। মুসলিম, কালাচাঁদ, সংগীতা, বর্ধন মিষ্টান্ন ভান্ডারের মতো দোকানগুলো এর জন্য বিখ্যাত। স্থানীয়রা বলেন, সরিষাবাড়ী গেলে প্যারা ছাড়া ফিরে আসা যায় না। এটি GI (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তাবিত হয়েছে।

যমুনা সার কারখানা

সরিষাবাড়ীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়েছে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড, যা এশিয়ার বৃহত্তম ইউরিয়া সার কারখানা। ১৯৯২ সালে তারাকান্দিতে স্থাপিত এই কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫.৬১ লাখ মেট্রিক টন। এটি পোগলদিঘা ইউনিয়নে অবস্থিত এবং যমুনা নদীর কাছাকাছি। কারখানাটি উত্তরবঙ্গের ১৯ জেলায় সার সরবরাহ করে এবং হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান করেছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেকবার কারখানা বন্ধ হলেও, ২০২৫ সালে পুনরায় চালু হয়েছে। এটি সরিষাবাড়ীকে শিল্পকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখছে।

বি এন পির সাবেক মহাসচিব ব্যারিষ্টার আঃ সালাম তালুকদার

সরিষাবাড়ী রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিএনপির সাথে যুক্ত ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদার (১৯৫০-১৯৯৯) সরিষাবাড়ির গনমানুষের নেতা এবং বিএনপির সাবেক মহাসচিব ছিলেন। তিনি জামালপুর-৪ আসনের সাংসদ এবং দলীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবার সরিষাবাড়ীর রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০২৫ সালে জামালপুর-৪ আসনে মনোয়ন পান তার ভাতিজা জনাব ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম সাহেব।

কবি কায়কোবাদের কর্মস্থল

সরিষাবাড়ীর পিংনা ইউনিয়নের পোস্ট অফিসে কবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) কর্মরত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম মহাকবি হিসেবে পরিচিত তিনি এখানে থাকাকালীন তার বিখ্যাত 'আযান' কবিতা রচনা করেন। পিংনা রসপাল মসজিদের মুয়াজ্জিনের আযান শুনে তিনি এই বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেন। উইকিপিডিয়া অনুসারে, পিংনা উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৬) প্রতিষ্ঠার সময়কালে তিনি এখানে পোস্টমাস্টার ছিলেন। 'মহাশ্মশান', 'অশ্রুমালা'র মতো মহাকাব্যের রচয়িতা কায়কোবাদ বাঙালি মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম সনেট রচয়িতাও। সরিষাবাড়ীর এই স্থানটি এখন সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য তীর্থস্থান, যা উপজেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

পাটশিল্পের ঐতিহ্য

একসময় সরিষাবাড়ী পাটশিল্পের কেন্দ্র ছিল। উপজেলায় ২২টি পাটের কুঠি ছিল, যেখানে ২২,০০০ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের পর এখানকার পাট ব্যবসা দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এখানে তিনটি বড় জুট মিল ছিল, যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করত। কিন্তু পরবর্তীকালে বাজার পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণে এগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এখনো পাট চাষ এখানকার প্রধান বাণিজ্যিক ফসল, এবং স্থানীয়রা এর পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার আশা করেন। এই ইতিহাস সরিষাবাড়ীর শিল্পজগতের গভীরতা সম্পর্কে ধারনা দেয়।

পিংনার মাটির হাঁড়ি-পাতিল

সরিষাবাড়ীর পিংনা ইউনিয়ন কুম্ভকার সম্প্রদায়ের জন্য বিখ্যাত, যারা মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরিতে দক্ষ। ব্রিটিশ আমলে এখানে ফৌজদারী আদালত ছিল এবং এখনো এই ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ চলছে। পিংনার মাটির পাত্রগুলো স্থানীয় বাজারে জনপ্রিয় এবং এটি উপজেলার স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ। এই কারিগরির মাধ্যমে শতাধিক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে।

সরিষাবাড়ীর নকশী কাঁথা

সরিষাবাড়ী উপজেলা (জামালপুর জেলা) বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প কেন্দ্র, যেখানে নকশী কাঁথা একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকশিল্প হিসেবে পরিচিত। এটি গ্রামীণ নারীদের নিপুণ হাতের সৃষ্টি, সুতোর ফোঁড়ে বিভিন্ন নকশা (যেমন ফুল, পাখি, গাছপালা, জীবনের গল্প) ফুটিয়ে তোলা হয়। সরিষাবাড়ীর নকশী কাঁথা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতীক। বর্তমানে সরিষাবাড়ির অনেক তরুন তরুনী এই কাথা অনলাইনে বিক্রি করে নিজেরা স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

সরিষাবাড়ী নৌকা বাইচ

সরিষাবাড়ী উপজেলা (জামালপুর জেলা) যমুনা নদী ও ঝিনাই নদীর তীরবর্তী অবস্থানের কারণে নৌকা বাইচের জন্য একটি আদর্শ স্থান। এখানে নৌকা বাইচ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন খেলা। বিশেষ করে বর্ষাকালে বা উৎসবের সময় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। কামরাবাদ ইউনিয়নের বীর বড় বাড়িয়া খেয়া ঘাটে নৌকা বাইচের জন্য পরিচিত। এছাড়া ধারাবর্ষা, সাতপোয়া গ্রামসহ সরিষাবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়।

নারাপাড়া দুর্গ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান

সরিষাবাড়ীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে ১৬শ শতাব্দীর নারাপাড়া দুর্গ এবং ১৯শ শতাব্দীর পাঁচগম্বুজ রাসপাল জামে মসজিদ। বাংলাপিডিয়া অনুসারে, এগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। মুক্তিযুদ্ধে এখানে চারটি যুদ্ধস্থল ছিল, যেমন বাউসী ব্রিজ এবং পারপাড়া। এই স্থানগুলো সরিষাবাড়ীর স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরে।

সরিষাবাড়ী তার কৃষি, শিল্প, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের জন্য একটি অনন্য উপজেলা। এখানকার মানুষের পরিশ্রম এবং ঐতিহ্য এটিকে বাংলাদেশের মানচিত্রে অমর করে রেখেছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url