সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হোমিও কলেজ
সরিষাবাড়ী উপজেলা, জামালপুর জেলার একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ অঞ্চল, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসা শিক্ষা একসাথে মিলে একটি আদর্শ উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেছে। এই উপজেলায় অবস্থিত সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (Sarishabari hospital) এবং সরিষাবাড়ী হোমিও কলেজ স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই আর্টিকেলে আমরা এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, সেবা, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করব, যাতে পাঠকরা প্রতিষ্ঠান দুটির অবদান সম্পর্কে জানতে পারেন।
সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স - Sarishabari upazila health complex
সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (যা স্থানীয়ভাবে সরিষাবাড়ী হাসপাতাল নামেও পরিচিত) জামালপুর জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত এই উপজেলার প্রধান স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এটি ৫০ শয্যার একটি সরকারি হাসপাতাল, যা ১৯৮০-এর দশক থেকে স্থানীয় জনগণের সেবায় নিয়োজিত। উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২.৫ লক্ষেরও বেশি, এবং এই হাসপাতালটি দৈনন্দিন চিকিৎসা, জরুরি সেবা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে। এছাড়া গরীব রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধপত্র প্রদান করা হয়।
হাসপাতালের সেবামূলক বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে সাধারণ চিকিৎসা, মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্য, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র। এছাড়া নরমাল ডেলিভারি, ছোটখাটো সার্জারি নিয়মিত করা হয়। এছাড়া বিনামূল্যে দাত ও চোখের চিকিৎসা দেওয়া হয়, গরীব রোগীদের মাঝে বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়। হাসপাতালের নির্ধারিত সময়ের পর অল্প টাকায় হাসপাতালের ভিতরেই প্রাইভেটভাবে ডাক্তার দেখানোরও ব্যবস্থা আছে।
উপজেলায় মোট ৮টি উপ-স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ৩৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, যা এই কমপ্লেক্সের সাথে যুক্ত হয়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক গঠন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, সরকারের উদ্যোগে এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন, ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং ইমার্জেন্সি ইউনিটের উন্নয়ন হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এই কমপ্লেক্সটি সামনের সারিতে ছিল। হাজারো রোগীকে ফ্রি চিকিৎসা ও টিকাদান সেবা প্রদান করে এটি উপজেলার স্বাস্থ্য রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে, চ্যালেঞ্জও কম নয়; ডাক্তার ও স্টাফের অভাব, ওষুধের সাপ্লাই এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে মিলে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে আরও ভালো সেবা নিশ্চিত করবে।
"সরিষাবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আমাদের উপজেলার হৃদয়স্পন্দন। এটি শুধু চিকিৎসা নয়, জীবনের আলো জ্বালায়।" – স্থানীয় একজন রোগী।
সরিষাবাড় হোমিও কলেজ
সরিষাবাড়ী উপজেলার শিক্ষা জগতে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত সরিষাবাড়ী হোমিও কলেজ। বাংলাপিডিয়া অনুসারে, উপজেলায় মোট ৯টি কলেজের মধ্যে এটি একমাত্র হোমিওপ্যাথি কলেজ হিসেবে স্বীকৃত। এটি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের অধীনে কার্যকর, এবং এখানে ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (DHMS) কোর্স পরিচালিত হয়। কলেজটি ২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা স্থানীয় যুবক-যুবতীদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ প্রদান করে।
হোমিওপ্যাথির দর্শন 'সিমিলিয়া সিমিলিবাস কুরেন্তার'—অর্থাৎ 'সদৃশ রোগ সদৃশ ওষুধে নিরাময়'—এর উপর ভিত্তি করে এই কলেজটি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেয়। কোর্সের সময়কাল ৪ বছর, যার মধ্যে থিওরি, প্র্যাকটিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং অন্তর্ভুক্ত। কলেজে আধুনিক ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং অ্যাটাচড হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে ছাত্ররা বাস্তব রোগীর চিকিৎসায় অংশ নেয়। উপজেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে এটি শিক্ষার হার ৪৪.৬% (পুরুষ ৪৬.৮%, মহিলা ৪২.৪%) উন্নয়নে সহায়তা করছে।
সাম্প্রতিককালে, কলেজটি অনলাইন ক্লাস এবং ডিজিটাল লার্নিং ইন্টিগ্রেট করে শিক্ষাকে আধুনিক করেছে। প্রতি বছর শতাধিক ছাত্র ভর্তি হয়, এবং অনেকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চিকিৎসক হিসেবে সক্রিয়। এই কলেজটি শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় হোমিওপ্যাথির প্রসারে একটি সেতুবন্ধন।
এছাড়া এখানে বিনামূল্যে প্রতিদিন রোগী দেখা হয় এবং ওষুধপত্র দেওয়া হয়। সরিষাবাড়ি হাসপাতালের মতো এই কলেজটিও সরিষাবাড়ির স্বাস্থ্য খাতে অবদান রেখে যাচ্ছে।
হোমিও কলেজে ভর্তির যোগ্যতা
সরিষাবাড়ী হোমিও কলেজসহ বাংলাদেশের যেকোনো হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের নির্দেশ অনুসারে, DHMS কোর্সে ভর্তির মূল যোগ্যতা নিম্নরূপ:
শিক্ষাগত যোগ্যতা: এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ন্যূনতম GPA ৩.০০ (বিজ্ঞান বিভাগ থেকে) এবং এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ন্যূনতম GPA ৩.৫০ (বিজ্ঞান বিভাগ: পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞান সহ) অর্জন করতে হবে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য, ২০২৩ বা ২০২৪ সনে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন।
বয়সসীমা: আবেদনের সময় ন্যূনতম ১৭ বছর বয়সী হতে হবে, কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। আবেদন প্রক্রিয়া: অনলাইনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট (dgme.gov.bd) থেকে ফর্ম পূরণ করতে হয়। ভর্তি পরীক্ষা হয় MCQ ভিত্তিক, যাতে বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান এবং ইংরেজি অন্তর্ভুক্ত। ফি ৩০০-৫০০ টাকা।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: এসএসসি/এইচএসসি সনদের সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম সনদ, ৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং চারিত্রিক সনদপত্র।
কোর্স ফি: সরকারি কলেজে বার্ষিক ফি ১০,০০০-২০,০০০ টাকা, যখন বেসরকারিতে ৫০,০০০-১,০০,০০০ টাকা।
ভর্তি সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে হয়, এবং মোট সিট সংখ্যা ৫০-১০০। যোগ্য শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখতে পারেন।