সরিষাবাড়ী উপজেলার ইউনিয়ন সংখ্যা

সরিষাবাড়ী উপজেলা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট। ১৯৮৩ সালে উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চলটি ২৬৩.৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার মধ্যে ৮টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং একটি পৌরসভা রয়েছে। এই ইউনিয়নগুলো উপজেলার প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। যমুনা নদী এবং ঝিনাই নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি কৃষি, শিল্প এবং ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। এই নিবন্ধে আমরা সরিষাবাড়ী উপজেলার ইউনিয়নসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক নিয়ে আলোচনা করব।

সরিষাবাড়ী উপজেলা ইউনিয়নের নাম - jamalpur sarishabari union

সরিষাবাড়ী উপজেলা ইউনিয়নের নাম এবং ইউনিয়নগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো।

১ নং সাতপোয়া ইউনিয়ন

সাতপোয়া ইউনিয়ন উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত এবং এটি যমুনা নদীর চরাঞ্চলে বিস্তৃত। এখানকার প্রধান অর্থনীতি ধান চাষ এবং মৎস্যচাষের উপর নির্ভরশীল। গ্রামসমূহের মধ্যে চর শিশুয়া, নগদা এবং বাঘমারা উল্লেখযোগ্য। চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়, যা স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রিত হয়।

২ নং পোগলদিঘা ইউনিয়ন পরিষদ

পোগলদিঘা উপজেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, যার আয়তন প্রায় ৯৮৮৩ একর। এখানে এশিয়ার বৃহত্তম ইউরিয়া সারকারখানা (যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি) অবস্থিত, যা হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান প্রদান করেছে। ইউনিয়নটিতে প্রায় ৩০টি গ্রাম রয়েছে এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার (১৯৯১ সালের তথ্য অনুসারে)।

পোগলদিঘা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান

৫ আগষ্টের পর থেকে ইউনিয়নগুলোতে বর্তমানে নির্বাচিত কোনো চেয়ারম্যান নেই।

৩ নং ডোয়াইল ইউনিয়ন

ডোয়াইল ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ, যেখানে ব্রিটিশ আমলে চরাঞ্চলীয় মুগ ডাল (সোনামুগ) উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘনবসতি রয়েছে। ইউনিয়নটির পূর্বে টাঙ্গাইল জেলা এবং পশ্চিমে পোগলদিঘার সীমান্তে অবস্থিত।

ডোয়াইল ইউনিয়ন ভূমি অফিস

ডোয়াইল ইউনিয়ন ভূমি অফিস চাপারকোনা বাজারের উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত।

৪ নং আওনা ইউনিয়ন

আওনা ইউনিয়ন নদীপথের ঐতিহ্যবাহী জেটি ঘাটের জন্য পরিচিত, যেখানে ব্রিটিশ আমলে স্টিমার চলাচল করত। এটি পাটশিল্পের কেন্দ্র ছিল এবং বর্তমানে কৃষি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল।

৫ নং পিংনা ইউনিয়ন

পিংনা ইউনিয়নে রয়েছে প্রাচীন রসপাল জামে মসজিদ (১৯শ শতাব্দী) ঐতিহাসিক নিদর্শন। ইউনিয়নটি যমুনা নদীবিধৌত এলাকায় অবস্থিত এবং ধান-পাট চাষের জন্য উর্বর। এছাড়া বিখ্যাত কবি কায়কোবাদ এখানে বসেই তার অমর সৃষ্টি আযান কবিতাটি লিখেছেন।

পিংনা গরুর হাট

পিংনা ইউনিয়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সাপ্তাহিক গরুর হাট হাটটি প্রতি শুক্রবার বসে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

৬ নং ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদ সরিষাবাড়ী

ভাটারা ইউনিয়ন উপজেলা পরিষদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং এটি সরিষাবাড়ী পৌরসভার কাছাকাছি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি এখানে ভাটারা বাজার কেন্দ্রিক ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটছে।

৭ নং কামরাবাদ ইউনিয়ন

কামরাবাদ ইউনিয়ন ঝিনাই নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত এবং পাটশিল্পের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছে। এখানকার চারটি ইউনিয়ন (পিংনা, পোগলদিঘা, আওনা, কামরাবাদ) নদীবিধৌত হয়ে ঐতিহাসিক গুরুত্ব অর্জন করেছে।

৮ নং মহাদান ইউনিয়ন

মহাদান ইউনিয়নের খাগুড়িয়া গ্রামে অবস্থিত খাগুড়িয়া কালী মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি তীর্থস্থান, যেখানে বার্ষিক তিনদিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বছরে চারটি হিন্দু উৎসব এখানে পালিত হয়। যেখানে ইন্ডিয়া থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও এখানে আসেন।

সরিষাবাড়ী উপজেলার ইউনিয়ন সংখ্যা
সরিষাবাড়ী উপজেলায় মোট ৮টি ইউনিয়ন – নাম ও বিস্তারিত তালিকা

এক নজরে ইউনিয়নগুলোর বৈশিষ্ট্যঃ

ক্রঃ ইউনিয়ন বৈশিষ্ট্য
সাতপোয়া চরাঞ্চলীয় কৃষি এবং যমুনা নদীতীরবর্তী গ্রামসমূহ।
পোগলদিঘা উপজেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন; যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানির অবস্থান।
ডোয়াইল সোনামুগ ডালের জন্য বিখ্যাত; হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘনবসতি।
আওনা ঐতিহ্যবাহী জেটি ঘাট এবং নদীপথের চলাচলের ইতিহাস।
পিংনা গরুর হাট এবং প্রাচীন রসপাল জামে মসজিদ (১৯শ শতাব্দী)।
ভাটারা ভাটারা বাজার কেন্দ্রিক ব্যবসা; কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি।
কামরাবাদ ঝিনাই নদীবিধৌত এলাকা; পাটশিল্পের ঐতিহ্য।
মহাদান খাগুড়িয়া কালী মন্দির এবং হিন্দু উৎসবের কেন্দ্র।

সরিষাবাড়ী পৌরসভার ৯ টি ওয়ার্ড ও গ্রাম সমূহ

সরিষাবাড়ী পৌরসভার ৯ টি ওয়ার্ড ও গ্রামগুলোর তথ্য নিচে এক নজরে তুলে ধরা হলো।

ওয়ার্ড গ্রাম
চর ধানাটা, বীর ধানাটা, সাতপোয়া।
সামর্থবাড়ী, আরামনগর, আরামনগর বাজার, ঝালুপাড়া, ভূরারবাড়ী।
মূলবাড়ী, বলার দিয়ার।
বিল শিমলা, শিমলা গোপীনাথ, শিমলা রঘুনাথ।
শিমলা পল্লী, কামরাবাদ।
শিমলা চাদ, চক হাটবাড়ী, কাঠিয়ার বাড়ী, দিয়ারকৃষ্ণাই, কোনাবাড়ী, মাইজাবাড়ী।
ইজারাপাড়া, বাংগালী পাড়া।
চৌখা (কিছু অংশ), বাউসী
বাউসী চন্দনপুর, গজারিয়া, নাওগোলা, চক বাংগালী, চর বাংগালী।

ইউনিয়নগুলোর অর্থনীতি এবং চ্যালেঞ্জ

সরিষাবাড়ীর ইউনিয়নগুলো প্রধানত কৃষিভিত্তিক, যেখানে ধান, পাট, গম, ভুট্টা, সরিষা, মরিচ এবং সবজি উৎপাদিত হয়। যমুনা ফার্টিলাইজার সারকারখানা পোগলদিঘায় অবস্থিত হয়ে শিল্পায়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। তবে বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নগুলোতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি যেমন পল্লী বিদ্যুতায়ন (৫৫.৬% পরিবারে বিদ্যুৎ সুবিধা) এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়) এই ইউনিয়নগুলোর উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

সরিষাবাড়ী উপজেলার ইউনিয়নসমূহ শুধু প্রশাসনিক ইউনিট নয়, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের প্রতিফলন। এগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অর্থনীতি সংরক্ষিত হয়েছে। ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে এই ইউনিয়নগুলো আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা করা যায়। আরও তথ্যের জন্য স্থানীয় উপজেলা অফিসে যোগাযোগ করুন অথবা উইকিপিডিয়া দেখুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url